ম-খুনের ঘটনায় মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার সাক্ষীর জবানবন্দিতে জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেছেন, আমি সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে জানতে পারি, মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকের ছত্রছায়ার ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এর কিছু ব্যক্তি নিয়মিত ডিজিএফআইয়ের অফিস ভিজিট (পরিদর্শন) করত। সেখানে সাতটি মিটিং রুম ছিল। এর একটিতে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’কে কাজ করতে দেওয়া হতো।
আজ সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে ইকবাল করিম ভূঁইয়ার সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়। প্যানেলের অপর সদস্য হলেন—বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ।
ইকবাল করিম ভূঁইয়া তার জবানবন্দিতে বলেন, আমি আমার দায়িত্ব পালনকালে জানতে পারি, মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকের ছত্রছায়ার ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এর কিছু ব্যক্তি নিয়মিত ডিজিএফআইয়ের অফিস ভিজিট করে এবং সেখানে যে সাতটি মিটিং রুম ছিল, এর একটিতে তাদেরকে কাজ করতে দেওয়া হতো। তারা বিভিন্ন সময়ে কিছু ব্যক্তিকে জঙ্গি হিসেবে চিহ্নিত করে তালিকা দিত ডিজিএফআইয়ের কাছে। এ তালিকার ওপর নির্ভর করে ডিজিএফআই কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিয়েছে কিনা, তা আমার জানা নেই। সেনাপ্রধানের তথ্য পাওয়ার জন্য অনেক সূত্র রয়েছে। তার অধীনে আর্মি সিকিউরিটি ইউনিট এবং ডাইরেক্টর মিলিটারি ইন্টেলিজেন্স নামে দুটি সংস্থা রয়েছে। এ ছাড়া র্যাবের অফিসার এবং অন্যান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে আলাপের মাধ্যমে আমি অনেক তথ্য জানতে পারতাম। আমি এসব তথ্যের মাধ্যমে জানতে পারি, আমাদের সেনাবাহিনীর জুনিয়র অফিসারদের মিসগাইড করা হচ্ছে এবং ভুল পথে পরিচালিত করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে আমি তিনটি ঘটনা উল্লেখ করব।
সাবেক এই সেনাপ্রধান জবানবন্দিতে বলেন, একজন কনিষ্ঠ কর্মকর্তা র্যাব থেকে প্রত্যাবর্তনের পরে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য আমার অফিসে আসেন। র্যাব থেকে যারা ফিরে আসত, তাদেরকে আমি প্রথম প্রশ্ন করতাম—তারা কতজন মানুষ হত্যা করেছে? আমি এ অফিসারকে একই প্রশ্ন করেছিলাম। সে উত্তরে বলল, ছয়জন। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ছয়জনকে কি তুমি সরাসরি হত্যা করেছো? উত্তরে সে বলল, দুজনকে সে সরাসরি হত্যা করেছে এবং বাকি চারজনকে হত্যার সময় সে উপস্থিত ছিল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, প্রতিটি হত্যার জন্য কত টাকা করে পেয়েছো? উত্তরে সে বলল, ১০ হাজার টাকা। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, টাকা নিয়ে কী করেছো? উত্তরে সে বললো, তার গ্রামের মসজিদে অনুদান হিসেবে টাকাগুলো দিয়েছে। আমি অনুধাবন করতে পারলাম, এই কাজগুলো সে ইচ্ছার বিরুদ্ধে করেছে এবং অপরাধবোধ থেকে সে টাকাগুলো মসজিদে দান করেছে।
ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, দ্বিতীয় ঘটনাতে একজন লে. কর্নেল আমার সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য অফিসে আসে। আমি তাকেও জিজ্ঞাসা করি, কতজনকে হত্যা করেছো? সে বললো, ছয়জন। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম কেন করেছো? উত্তরে সে বললো, ঊর্ধ্বতন অফিসারের আদেশ পালন করেছি। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, আমি তোমার ঊর্ধ্বতন অফিসার কিনা? সে বললো, হ্যাঁ। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, আমি যদি আমার হাগু তোমাকে খেতে বলি খাবে কিনা? সে বললো, না। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম নিরস্ত্র বেসামরিক ব্যক্তিকে হত্যা করা এবং হাগু খাওয়ার মধ্যে কোনটা নিকৃষ্ট? সে বললো, নিরস্ত্র বেসামরিক ব্যক্তিকে হত্যা করা। আমি তাকে বললাম, তাহলে কেন করেছো? উত্তরে সে নিশ্চুপ থেকেছে।
জবানবন্দিতে ইকবাল করিম ভূঁইয়া আরও বলেন, তৃতীয় ঘটনাতে একজন মেজর, যিনি আগে আমার সঙ্গে চাকরি করেছেন। র্যাবে পোস্টিং হওয়ার কিছুদিন পর তিনি আমার সঙ্গে সেনাভবনে দেখা করেন। তার আগের একটি ঘটনা আমার কর্ণপাত হওয়ার কারণে আমি তাকে ওই বিষয়ে জিজ্ঞাসা করি। ঘটনাটি ছিল—হোটেল রেডিসনে চাকরিরত একটি মেয়েকে কিছু দুর্বৃত্ত রাতে বাড়ি ফেরার সময় ধর্ষণ ও হত্যা করে। র্যাব পরে সেই ব্যক্তিদের হত্যা করে, যাদের মধ্যে উক্ত মেজরও ছিল। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করি, তুমি আইন নিজের হাতে কেন তুলে নিয়েছো? সে বললো, এই ব্যক্তিগুলো সমাজবিরোধী এবং তাদের বেঁচে থাকার অধিকার নেই। আমি তাকে বললাম, তুমি যে আইন ভঙ্গ করে তাদেরকে হত্যা করেছো, তুমিওতো সমাজবিরোধী। সে এরপর নিশ্চুপ হয়ে যায়। পরবর্তীতে আমি তাকে প্রতিজ্ঞা করাই যেন সে র্যাবে আর এই ধরনের কাজ না করে। তবে হতাশার সঙ্গে দেখি, কিছুদিন পর ওই মেজর ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছে। এতে দেখা যায়, শাপলা চত্বরের ধোঁয়াটে পটভূমিতে সে ও কর্নেল জিয়া একে অপরের কাঁধে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে। অসংখ্য ইন্টারভিউয়ের (সাক্ষাৎকারের) মধ্যে এগুলো ছিল অল্প কয়েকটি উদাহরণ। শাপলা চত্বরের ঘটনাটি আমরা সবাই জানি।
সাক্ষী ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, এবার র্যাবের কথা বলছি। সেনাপ্রধান হওয়ার পূর্ব থেকেই অন্যান্য সামরিক সদস্যদের মতোই র্যাব সদস্যদের অবৈধ ও বিচার বহির্ভূত কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিত ছিলাম। সেনাপ্রধান হবার পর পরই আমি র্যাবের এডিজি তৎকালীন কর্নেল (পরবর্তীতে লে. জেনারেল) মুজিবকে আমার অফিসে ডেকে পাঠাই এবং এসব ক্রসফায়ার বন্ধ করতে বলি। আমি তাকে র্যাব ইন্টেলিজেন্সের প্রধান লে. কর্নেল জিয়াউল আহসানকে নিয়ন্ত্রণ করতে বলি। তিনি আমাকে কথা দেন আর এ ধরনের ঘটনা ঘটবে না। পরবর্তীতে কিছুদিন আমি পত্রিকাতে ক্রসফায়ারের ঘটনা দেখিনি। কিন্তু অচিরেই উপলব্ধি করতে পারি ঘটনা ঘটছে, কিন্তু তা চাপা দেওয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি আরও বদলে যায়, যখন বেনজীর আহমেদ র্যাবের ডিজি হয়ে আসেন এবং জিয়াউল আহসান এডিজি হন।
সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া তার জবানবন্দিতে বলেন, আমি শুনেছি, র্যাব যাদেরকে হত্যা করত, তাদের পেট চিরে নাড়িভুড়ি বের করে ইট পাথর বেঁধে নদীতে ডুবিয়ে দিত। র্যাবের এসব কর্মকাণ্ড দেখতে আমি বিভিন্ন ডিভিশন ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান ভিজিট করতে থাকি এবং অফিসারদেরকে এসব কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে মোটিভেট করতে শুরু করি। একপর্যায়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর যত কমান্ডিং অফিসার আছে, তাদেরকে ঢাকায় এনে জুনিয়র অফিসারদের প্রতি তাদের কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করি। তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেই, শেখ মুজিব ও জিয়া হত্যার সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে অনেক অফিসারের ফাঁসি হয়েছে। ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলায় আরও কিছু সামরিক অফিসার ফাঁসির দণ্ড মাথায় নিয়ে হাজতবাস করছে। এতকিছুর পরও যখন বুঝতে পারি—ক্রসফায়ার থামছে না, তখন আমি ডিজিএফআই, বিজিবি ও র্যাব থেকে অফিসার নিয়ে আসা এবং পোস্টিং করা বন্ধ করে দেই। এ সময় অনেকে আমাকে মনে করিয়ে দেন, আমি যা করছি তা বিদ্রোহের শামিল। আমার উত্তর একটাই ছিল—হাশরের ময়দানে আমাকে আল্লাহর কাছে জবাব দিতে হবে। পোস্টিং বন্ধ করার প্রতিক্রিয়াও ছিল মারাত্মক। আমি প্রতিনিয়ত অফিসার পোস্টিং করার জন্য এমএসপিএমের কাছ থেকে টেলিফোন পেতে থাকি। এক সময় র্যাবের (তৎকালীন) মহাপরিচালক (ডিজি) বেনজীর আহমেদ আমার অফিসে আসেন এবং র্যাবে অফিসার দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানান। আমি তাকে কোনো কথা দেইনি।
সাবেক সেনাপ্রধান তার জবানবন্দিতে বলেন, আমি ইন্টেলিজেন্স ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জগলুল আহসান ও কমান্ডিং অফিসার আর্মি সিকিউরিটি ইউনিট ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফজলকে (যিনি বর্তমানে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে আছেন) জিয়াউল আহসানের সঙ্গে কথা বলতে বলি। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জগলুল আহসান এসে আমাকে জানান, তিনি কথা বলেছেন এবং কোনো ভালো প্রতিশ্রুতি তার কাছ থেকে পাননি। এরপর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফজল এসে আমাকে জানান, কথা বলে কোনো লাভ হয়নি, ওর (জিয়াউল আহসান) মাথা ইট ও পাথরের টুকরো দিয়ে ঠাসা। পরবর্তীতে আমাকে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ফজল জানান, জিয়াউল আহসান তার বাসায় অস্ত্র রাখে, গার্ড মোতায়েন রাখে ও সিসিটিভি ক্যামেরা লাগিয়ে রেখেছে। তাকে সামরিক কোয়ার্টারে থাকার নিয়ম-কানুন মেনে এগুলো পরিত্যাগ করতে বলা হয়।
ইকবাল করিম ভূঁইয়া আরও বলেন, পরবর্তীতে জিয়াউল আহসান, মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক ও তার কোর্সমেট এএমএসপিএম কর্নেল মাহবুবের (বর্তমানে মেজর জেনারেল) ছত্রছায়ায় আমার আদেশ অমান্য করতে শুরু করে। দুজন অফিসারকে বিভিন্ন নেতিবাচক রিপোর্টের কারণে শান্তি দেওয়ার জন্য র্যাব থেকে সেনাবাহিনীতে ফেরত আনার জন্য পোস্টিং আদেশ জারি করার পরও সে (জিয়াউল আহসান) তাদেরকে ফিরিয়ে দিতে অস্বীকার করে। আমি জিয়াউল আহসানকে সেনানিবাসে প্রবেশ নিষিদ্ধ করি। এটি কার্যকর করার জন্য লজিস্টিক এরিয়া কমান্ডার মেজর জেনারেল মিজানকে দায়িত্ব দেই। পরবর্তীতে বিষয়টি মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিককে না জানানোর জন্য তার বিরাগভাজন হন মেজর জেনারেল মিজান। অচিরেই আমি এমএসপিএম মেজর জেনারেল মিয়া জয়নুল আবেদিনের কাছ থেকে ফোন পাই।
জিয়াউল আহসানের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে চাপ দেয় প্রধানমন্ত্রী
চট্টগ্রামে হোটেল রেডিসন উদ্বোধনের সময় তদানিন্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুলিশদের সঙ্গে বৈঠককালে আমাকে ডেকে নেন এবং র্যাবে অফিসার দিতে বলেন। স্বল্পতার কারণে র্যাবে অফিসার দেওয়া সম্ভব নয় বলে আমি তাকে জানাই। অবসর গ্রহণের আগ পর্যন্ত আমার ওপর এ চাপ অব্যাহত ছিল। তবে আমি আমার সিদ্ধান্তে অটল ছিলাম।
ইকবাল করিম ভূঁইয়া আদালতকে জানান, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী (শেখ হাসিনা) বলেছেন—জিয়াউল আহসানের ওপর যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে, তা তুলে নেওয়ার জন্য। আমি না বলেছি। আমাকে তখন মেজর জেনারেল মিয়া জয়নুল আবেদিন জিজ্ঞাসা করেন, কোনো চাকরিরত অফিসারকে অবাঞ্চিত ঘোষণা করা কি বিশেষ পদক্ষেপ? আমি বলি—হ্যাঁ, এটি বিশেষ পদক্ষেপ এবং তুমি যদি সেনাপ্রধানের আদেশ অমান্য করো, তাহলে তোমারও একই অবস্থা হবে। দুদিন পর সংঘাত এড়ানোর জন্য আমি নিজে থেকেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেই।
সেনাবাহিনী র্যাবে গিয়ে পেশাদার খুনি হয়ে ফেরত আসছে
ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, আমাকে যে জিনিসটা সবচেয়ে ব্যথিত করত, তা হলো আমরা সেনাবাহিনী থেকে র্যাবে পেশাদার অফিসার পাঠাচ্ছি, আর তারা পেশাদার খুনি হয়ে ফেরত আসছে। এরপর আমি সিদ্ধান্ত দেই র্যাব, ডিজিএফআই ও বিজিবিতে কোনো অফিসার পোস্টিংয়ে যাওয়ার পূর্বে এবং পরে আমার ইন্টারভিউতে আসবে। যারা র্যাবে যেত তাদেরকে আমি এই বলে মটিভেট করতাম, নরহত্যা মহাপাপ এবং কাউকে হত্যা করলে তার পরিবারের অভিশাপ তোমার পরিবারের ওপর পড়বে।
সাবেক এই সেনাপ্রধান আদালতকে আরও বলেন, একজনকে হাত-পা বেঁধে হত্যা করা অত্যন্ত কাপুরুষোচিত কাজ। সত্যিকারের সাহস হচ্ছে, হাত-পা খুলে তার হাতে একটি অস্ত্র দিয়ে সম্মুখ যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া। যারা ফেরত আসত, তাদের কাছে বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের রোমহর্ষক বর্ণনা শুনে আমি সেনাবাহিনীর ভবিষ্যত নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লাম। আমি (তৎকালীন) প্রধানমন্ত্রীর (শেখ হাসিনা) সঙ্গে দেখা করে সেনাবাহিনীর র্যাব সদস্যদেরকে সেনাবাহিনীতে ফেরত আনার জন্য আবেদন জানাই। তিনি স্বীকার করেন, র্যাব রক্ষীবাহিনীর চেয়েও খারাপ। তিনি কোনো কথা দেননি এবং পরবর্তীতে এ নিয়ে আর কোনো পদক্ষেপ নেননি।
ইকবাল করিম ভূঁইয়া জবানবন্দিতে বলেন, পরবর্তীতে আমি ইন্টারভিউতে আসা অফিসারদের এই বলে সাহস জোগালাম—যদি কাউকে কোনো কিলিং মিশনের জন্য বলা হয়, সে যেন আমাকে সরাসরি ফোন করে। আমি তাদেরকে সেনাবাহিনীতে সম্মানের সঙ্গে ফেরত নিয়ে আসব এবং পুনর্বাসিত করব। পাশাপাশি যারা র্যাবে নতুন যাচ্ছেন, তাদেরকে মিলিটারি সেক্রেটারি মেজর জেনারেল আনোয়ার, ডিএমআই এবং আমার পিএস কর্নেল সাজ্জাদও (বর্তমানে মেজর জেনারেল) মোটিভেট করতে থাকেন। কিছুদিন পর ডিএমআই ব্রিগেডিয়ার জগলুল আমাকে এসে জানান, আমাদের মোটিভেশনে কোনো কাজ হচ্ছে না।
সাক্ষী ইকবাল করিম ভূঁইয়া আরও বলেন, র্যাবে যোগদানের পরে অফিসারদেরকে ডিমোটিভেট করা হচ্ছে। তবুও দুজন অফিসারকে যখন প্রথম রাত্রেই কিলিং মিশনে যেতে বলা হয়, তারা ওখান থেকে চলে এসে ঢাকা সেনানিবাসের এমপি চেকপোস্টে রিপোর্ট করেন। আমি তাদেরকে সসম্মানে সেনাবাহিনীতে পুনর্বাসিত করি। এরই মধ্যে কর্নেল জিয়াউল আহসানের বিরাগভাজন হন ডিএমআই ব্রিগেডিয়ার জগলুল। তাকে মেজর জেনারেল তারেক আহমেদ সিদ্দিক ডিএমআই পদ থেকে সরিয়ে দেন। সাধারণত ডিএমআই সেনাপ্রধানের পছন্দের ব্যক্তি হয়ে থাকে এবং তাকে সেনাপ্রধানই নিয়োগ দিয়ে থাকেন। কিন্তু এক্ষেত্রে তাকে আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাকে বদলি করে দেওয়া হয়, যা ছিলো আমার জন্য অত্যন্ত অপমানজনক। আর্মি সিকিউরিটি ইউনিটের কমান্ডিং অফিসার ব্রিগেডিয়ার ফজলকেও বদলি করার চেষ্টা করা হয়, কিন্তু আমার প্রবল বিরোধিতার কারণে তা ব্যর্থ হয়।
র্যাব-ডিজিএফআই বিলুপ্ত করা হোক
ইকবাল করিম ভূঁইয়া ট্রাইব্যুনালকে বলেন, র্যাবের কর্মকাণ্ডের কারণে আমার দায়িত্বকালীন সময়টি ছিল অত্যন্ত কষ্টদায়ক। কিছু না করতে পারার বেদনা আমাকে সবসময় আচ্ছন্ন করে রাখত। আজ সুযোগ এসেছে, সেই করতে না পারা কাজটি সম্পন্ন করার। অনেকেই ভাবছেন, আমি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছি। এ ব্যাপারে আমার ব্যাখ্যা হচ্ছে—আমরা যতই অস্বীকার করার চেষ্টা করি না কেন, সেনাবাহিনী কলুষিত হয়েছে। আত্মশুদ্ধির যে সুযোগ এসেছে তা কোনো অবস্থাতেই হেলায় হারানো আমাদের উচিত হবে না। এতে সেনাবাহিনীর গৌরব ক্ষুণ্ণ হবে না, বরং সেনাবাহিনী গৌরবের উচ্চ শিখরে আসীন হবে। পুরো জাতি জানবে, সেনাবাহিনী কখনো দোষী ব্যক্তিদের ছাড় দেয় না। এতে সেনাবাহিনীর গৌরব ও সম্মানের সাইনবোর্ডের আড়ালে অফিসারদের অপকর্ম করে পার পেয়ে যাওয়ার প্রবৃত্তি দূর হবে। আমি চাই, র্যাব অবিলম্বে বিলুপ্ত করা হোক। সেটি সম্ভব না হলে সামরিক সদস্যদেরকে সামরিক বাহিনীতে ফিরিয়ে আনা উচিত। আমি আরও চাই, ডিজিএফআইকেও বিলুপ্ত করা হোক। কারণ, এই সংস্থাটি আয়নাঘরের মতো অপসংস্কৃতি জন্ম দেওয়ার পরে টিকে থাকার বৈধতা হারিয়েছে।
