ফ্যাসিবাদী সরকারের লাগামহীন লুটপাটে অর্থনীতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে

বিগত ১৬ বছরে ফ্যাসিবাদী সরকারের সীমাহীন দুর্নীতি ও লাগামহীন লুটপাটের কারণে অর্থনীতি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। একইসাথে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক খাত অকার্যকর হয়ে পড়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

শুক্রবার (১০ এপ্রিল) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১৩তম দিন সকালে ৩০০ বিধিতে দেয়া বিবৃতিতে তিনি এসব তথ্য তুলে ধরেন। ১৩তম দিনে সংসদের সভাপতিত্ব করছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।
অর্থমন্ত্রী বিবৃতিতে বলেন, কোন অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেশের দায়িত্ব নেয়া হয়েছে এবং আগামীর যাত্রা কোথায় হবে সে সম্পর্কে একটি সংক্ষিপ্ত বিবৃতি প্রদান করা হচ্ছে।

আওয়ামী লীগ সরকারের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতির চালচিত্র
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে মহান সার্বভৌম সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। বর্তমান মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বে জনগণ মোট চারবার শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে এ সুযোগ দিয়েছিল। সর্বশেষ ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল মেয়াদে আমরা এ দায়িত্ব পালন করেছি। জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল জনগণের কাছে দায়বদ্ধতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতায় বিশ্বাস করে এবং জনগণকে সাথে নিয়ে দেশের উন্নয়নে কাজ করে। এ দায়বদ্ধতা থেকে আমি আজ এই মহান সংসদের মাধ্যমে আমাদের সর্বশেষ অর্থবছর ২০০৫-০৬, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছর এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সামষ্টিক অর্থনীতির সূচক, সামাজিক খাতের সূচক এবং প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থার একটা চিত্র দেশবাসীকে অবহিত করতে পারি। পাসাপাসি, জনগণের ভাগ্যোন্নয়নে একটি উন্নত, মর্যাদাশীল ও বৈষম্যহীন মানবিক রাষ্ট্র গঠনে আমাদের প্রতিশ্রুতি দর্শন ও নীতি কৌশলের বিষয়েও দেশবাসীকে অবহিত করতে চাই।বাংলাদেশ ভ্রমণ গাইড

ফ্যাসিস্ট সরকারের অপশাসন, ভ্রান্ত নীতি ও ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতির চিত্র
বিগত ১৬ বছরে ফ্যাসিবাদী সরকার অর্থনীতিতে সীমাহীন দুর্নীতি ও লাগামহীন লুটপাটের মাধ্যমে অর্থনীতিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে দাঁড় করানোর পাশাপাশি সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক খাতকে অকার্যকর করে দিয়েছে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল সরকারের দূরদর্শী ও জনকল্যাণমুখী অর্থনৈতিক দর্শনের কারণে অর্থনীতির মূল সূচকগুলো যেখানে ইতিবাচক ধারায় নিয়ে এসে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি ত্বরান্বিত করে গিয়েছিল, বিগত ১৬ বছরে তা অনেকটাই ধূলিসাৎ করা হয়েছে।

সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি
প্রথমেই আমি বিগত সরকারের আমলে সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলোর বাস্তব চিত্র আপনার মাধ্যমে দেশবাসীকে জানাতে চাই। উক্ত সময়কালে অর্থনীতির আকার বৃদ্ধি পেলেও এর ভেতরে বেশকিছু কাঠামোগত দুর্বলতা ধীরে ধীরে প্রকট হয়ে ওঠে। আমি কিছু উপাত্ত আপনার মাধ্যমে মহান সংসদে তুলে ধরছি (বিস্তারিত উপাত্ত সংযুক্তি-১ হিসেবে উপস্থাপিত হবে)।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি
২০০৫-০৬ অর্থবছরে স্থির মূল্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৬.৭৮ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ছিল তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে অর্থাৎ ৭.১৭ শতাংশে। পরবর্তীকালে অর্থনীতির আকার বাড়লেও দুর্বৃত্তায়ন ও ভ্রান্ত নীতির কারণে ২০২৩-২৪ অর্থবছর শেষে প্রবৃদ্ধির হার কমে ৪.২২ এবং মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে ৯.৭৩ তে পৌঁছায়। ২০০৫-০৬ সালে শিল্পখাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ১০.৬৬ শতাংশ, ২০২৩-২৪ সালে সেটা নেমে এসেছে মাত্র ৩.৫১ শতাংশে। কৃষিতে প্রবৃদ্ধি ছিল ৫.৭৭ শতাংশ, তা ২০২৩-২৪ সালে কমে হয়েছে ৩.৩০ শতাংশ।

কর্মসংস্থান
একটি অর্থনীতি যখন শিল্পের চালিকাশক্তি হারিয়ে ফেলে, তখন কর্মসংস্থান সংকুচিত হয় এবং সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা হ্রাস পায়। বিগত সময়ে এটি চরমভাবে পরিলক্ষিত হয়েছে। বিগত এক দশকে দেশের অর্থনীতির প্রধান তিনটি খাতের মধ্যে কৃষিখাতে মূল্য সংযোজনের অংশ কমেছে প্রায় ৪ শতাংশ, অন্যদিকে শিল্প ও সেবা খাতের অবদান বেড়েছে। কিন্তু এই সময়ে কৃষিখাতে কর্মসংস্থান বেড়েছে ৪.৮ শতাংশ, আর শিল্প ও সেবা খাতে কর্মসংস্থান কমেছে। শিল্প ও সেবা খাতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়ায় তরুণরা বাধ্য হয়ে কৃষি খাতেই বেশি করে নিয়োজিত হয়েছে। এতে করে ছদ্ম-বেকারত্ব তীব্রতর হয়েছে এবং তরুণদের শ্রমশক্তি অপচয় হয়ে তাদের উৎপাদনশীলতা ও আয় বৃদ্ধির সম্ভাবনাকে সীমিত করছে। বর্তমানে কৃষিখাত মোট জাতীয় মূল্য সংযোজনের মাত্র ১১.৬ শতাংশ যোগ করলেও মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৪১ শতাংশ এই খাতে নিয়োজিত। এই বৈপরীত্য কৃষিখাতে শ্রমের নিম্ন উৎপাদনশীলতাকে ইঙ্গিত করে ও শ্রমবাজারের গভীর কাঠামোগত দুর্বলতাকেই স্পষ্ট করে, এবং এটা কর্মসৃজনবিহীন প্রবৃদ্ধি (job-less growth)-এর ঝুঁকিরই পরিচায়ক।

সঞ্চয় ও বিনিয়োগ
২০০১-২০০৬ সময়ে বিনিয়োগ ও সঞ্চয়ের মধ্যে একটি সুস্থ ভারসাম্য বজায় রাখতে নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল, যেখানে জাতীয় সঞ্চয় জিডিপির ২৯.৯৪ শতাংশ এবং মোট বিনিয়োগ ছিল ২৮.৭৫ শতাংশ। ২০২৩-২৪ সালে এই চিত্র উল্টে গেছে, বিনিয়োগ জিডিপির ৩০.৭০ শতাংশ হলেও সঞ্চয় নেমে এসেছে ২৮.৪২ শতাংশে। বিনিয়োগ সঞ্চয়কে ছাড়িয়ে যাওয়ায় অতিরিক্ত চাহিদা বৈদেশিক উৎস হতে সংস্থান করা হয়েছে। ফলে বহিঃখাতের উপর চাপ বেড়েছে।

Leave a Comment

Scroll to Top