ইউরোপ স্বপ্নে সাগরে ১৮ বাংলাদেশির মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় মানব পাচারকারী চক্রের প্রধান দুই সদস্যকে শনাক্ত করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এই ঘটনায় জড়িতদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে এখন চলছে মামলার প্রস্তুতি। ইতোমধ্যে উন্নত জীবনের আশায় সাগরপথে পাড়ি জমাতে গিয়ে প্রাণ হারানো এই ১৮ জনের মৃত্যুর পেছনে কাজ করা পাচারকারী চক্রের শিকড় খুঁজে বের করতে মাঠে নেমেছে তদন্তকারীরা।
জানা যায়, রাবারের নৌকায় করে লিবিয়া থেকে সাগরপথে গ্রিসের দিকে নেওয়া হচ্ছিল কিছু বাংলাদেশিকে। এদের মধ্যে মৃত ১৮ জনকে দুদিন নৌকায় রেখে পরে তাদের লাশ সাগরে ফেলে দেওয়া হয়। জীবিত উদ্ধার ২১ বাংলাদেশিসহ ২৬ জনকে রাখা হয়েছে গ্রিসের একটি ক্যাম্পে। তাদের মধ্যে অনেকেই গুরুতর অসুস্থ।
নিহতদের পরিবার ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাংলাদেশ থেকে যাদের ইউরোপে অবৈধ পথে নেওয়ার জন্য লিবিয়ায় জড়ো করা হয়েছিল, এতে ভূমিকা রাখা দুজনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের একজন সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার ঈদগাঁও এলাকার আজিজ মিয়া। আরেকজন ছাতক উপজেলার দুলাল মিয়া। দালালদের মাধ্যমে জনপ্রতি ১২ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়েছে আজিজ ও দুলাল। তাদের বিরুদ্ধে মামলা করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
শনিবার বেঁচে ফেরা একই নৌকার ২১ বাংলাদেশি গ্রিসের কোস্টগার্ডকে জানান, ২২ অভিবাসনপ্রত্যাশী মারা গেছেন। ১৮ বাংলাদেশি ছাড়া বাকি চারজন বিভিন্ন দেশের নাগরিক। নৌকাটি পথ হারিয়ে সাগরে ছয় দিন ভাসছিল। এতে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দেয়।
বাংলাদেশ মিশন ইতোমধ্যে গ্রিসের কোস্টগার্ড ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সহায়তায় বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের সহযোগিতা এবং নিহতদের মরদেহের সন্ধান পেলে ফিরিয়ে আনার উপায় খোঁজা হচ্ছে।
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে জীবিত উদ্ধার হওয়া একজন জানান, একটি ছোট নৌকায় তারা ৪৩ জন ছিলেন, যার মধ্যে ৩৮ জনই ছিলেন বাংলাদেশি। তাদের একটি বড় নৌকায় পাঠানোর কথা বলে শেষ মুহূর্তে ছোট নৌকায় তুলে দেয় পাচারকারীরা।
সিআইডির মানব পাচার প্রতিরোধ ইউনিটের বিশেষ পুলিশ সুপার বদরুল আলম মোল্লা বলেন, গ্রিসে যাওয়ার পথে ১৮ বাংলাদেশি মারা যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে দূতাবাস। যেসব দালাল তাদের নিয়েছে তাদের শনাক্ত করার কাজ শুরু হয়েছে। ভূমধ্যসাগরে নিহতদের মধ্যে ১২ জনই সুনামগঞ্জের বাসিন্দা। দিরাই উপজেলার ছয়জন, জগন্নাথপুরের পাঁচজন এবং দোয়ারাবাজারের একজন রয়েছেন। এ ছাড়া নিহতদের মধ্যে কিশোরগঞ্জের বাসিন্দাও রয়েছেন।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাব, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং দীর্ঘ সময় সমুদ্রে ভেসে থেকে তাদের মৃত্যু হয়েছে।
জগন্নাথপুর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা বরকত উল্লাহ বলেন, যে নৌকায় বাংলাদেশিদের লিবিয়া থেকে গ্রিসে নেওয়ার হচ্ছিল, তার চালক ছিলেন সুদানের এক নাগরিক। যাত্রা শুরুর আগে চালকের কাছে মানচিত্র ও জিপিএস দেওয়া হয়েছিল। তবে তিনি এসব হারিয়ে ফেলায় দিগ্ভ্রান্ত হয়ে ৬ দিন নৌকা সাগরে ভাসতে থাকে। খাবার ও পানি সংকটের কারণে অনেকে মারা যান। এ ছাড়া লিবিয়ায় যেখানে তাদের রাখা হয় সেখানেও ঠিকঠাক খাবার দেওয়া হতো না। তাই আগে থেকে অনেকে শারীরিকভাবে অসুস্থ ছিলেন।
তিনি বলেন, নিহতদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেছি। অনেকে ঝুঁকি জেনেও স্বজনদের পাঠান। কেউ কেউ দেখেন, পাশের বাড়ির একজন ইউরোপ গিয়ে পরিবারে সচ্ছলতা ফিরিয়ে এনেছে। আবার অনেককে দালালরা টোপ দিয়ে থাকেন। এবারের ঘটনায় জড়িত দালালদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে। সূত্র- সমকাল
