সম্প্রতি ফাঁস হওয়া একটি অডিও ঘিরে নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছেন ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি। সেখানে দাবি করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান তিনি, যদিও একই হামলায় নিহত হন তার বাবা আলি খামেনিসহ শীর্ষ নেতারা। ঘটনার বিস্তারিত উঠে এসেছে এক গোপন বৈঠকের রেকর্ডে।
সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ বলছে, ফাঁস হওয়া একটি অডিওতে দাবি করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গেছেন ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি। হামলার ঠিক কয়েক মিনিট আগে বাড়ির বাগানে হাঁটতে বের হওয়ায় তিনি প্রাণে রক্ষা পান।
ব্রিটিশ পত্রিকা দ্য টেলিগ্রাফের হাতে পাওয়া ওই অডিওতে বলা হয়েছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি স্থানীয় সময় সকাল ৯টা ৩২ মিনিটে ইসরায়েলের ‘ব্লু স্প্যারো’ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তার বাসভবনে আঘাত হানে। একই হামলায় তার বাবা আলি খামেনিসহ ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের কয়েকজন নিহত হন। তবে হামলার ঠিক আগে ‘একটি কাজের জন্য’ বাইরে যাওয়ায় তিনি রক্ষা পান।
অডিওটি আলি খামেনির দপ্তরের প্রটোকল প্রধান মাযাহের হোসেইনির বক্তব্য থেকে নেয়া। তিনি জ্যেষ্ঠ ধর্মীয় নেতাদের ও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর কমান্ডারদের এক বৈঠকে হামলার বিস্তারিত তুলে ধরেন। এই বক্তব্যের রেকর্ডিং ফাঁস হয়ে তথ্যটি সামনে আসে এবং সেটি দ্য টেলিগ্রাফ তা যাচাই করেছে বলে জানানো হয়েছে।
মাযাহের হোসেইনি জানান, হামলায় মোজতবা খামেনির পায়ে আঘাত লাগে। তবে তার স্ত্রী জাহরা হাদ্দাদ-আদেল ও ছেলে ঘটনাস্থলেই নিহত হন। তার ভগ্নিপতির মাথা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আলি খামেনির সামরিক দপ্তরের প্রধান মোহাম্মদ শিরাজির দেহও বিস্ফোরণে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। হোসেইনি বলেন, ‘মাত্র কয়েক কেজি মাংস’ উদ্ধার করে তার দেহ শনাক্ত করা সম্ভব হয়। ১২ মার্চ তেহরানের কোলহাক এলাকায় অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।
ইরানের রাজধানীতে একই কম্পাউন্ডে বাবা আলি খামেনির সঙ্গে বসবাস করতেন মোজতবা খামেনি। সেখানে একটি ধর্মীয় মিলনায়তন ছিল এবং সেখানেই আলি খামেনি ভাষণ দিতেন। তার অন্যান্য সন্তানের বাসাও ওই কম্পাউন্ডেই ছিল। ২৮ ফেব্রুয়ারি আলি খামেনি ও শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তারা বৈঠকে থাকা অবস্থায় ওই কম্পাউন্ডে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়। এতে আইআরজিসি প্রধান মোহাম্মদ পাকপুর, প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদে এবং আলি খামেনি নিহত হন।
হোসেইনি বলেন, ‘আল্লাহর ইচ্ছায় মোজতবা বাইরে গিয়েছিলেন। তিনি তখন বাইরে ছিলেন এবং সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠছিলেন, ঠিক তখনই ভবনটিতে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। তার স্ত্রী সঙ্গে সঙ্গেই শহিদ হন’। তিনি আরও বলেন, মোজতবা খামেনির আঘাত ছিল ‘সামান্য’।
হোসেইনির ভাষ্য অনুযায়ী, কম্পাউন্ডের একাধিক স্থানে একযোগে হামলা চালানো হয় এবং পুরো খামেনি পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করার লক্ষ্যই ছিল হামলার উদ্দেশ্য। তিনি বলেন, ‘ওরা কম্পাউন্ডের কয়েকটি জায়গা লক্ষ্য করে হামলা চালায়, যার একটি ছিল সর্বোচ্চ নেতার অবস্থান। সেখানে তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে।’
এ ছাড়া ওপরতলায় থাকা মোজতবার বাসভবন, নিচতলায় তার ভগ্নিপতি মিসবাহ আল-হুদা বাঘেরি কানির বাসা এবং তার ভাই মোস্তফা খামেনি ও তার স্ত্রীর বাসভবনেও আঘাত হানে ক্ষেপণাস্ত্র। হোসেইনি বলেন, ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত এতটাই শক্তিশালী ছিল যে তা নিচতলায় গিয়ে মিসবাহর কক্ষে আঘাত করে এবং তার মাথা দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়।
অন্যদিকে, মোস্তফা খামেনি ও তার স্ত্রী পাশের আরেকটি বাসভবনে ছিলেন। সেটিতেও আঘাত লাগে, তবে তারা অক্ষত অবস্থায় বেরিয়ে আসেন। হামলার পর থেকে আলি খামেনির অন্য কোনও সন্তান প্রকাশ্যে আসেননি। মোজতবা খামেনিকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে বেছে নেয়ার পরও তারা কোনও আনুগত্যের বার্তা দেননি।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কিংবা দায়িত্ব নেয়ার ১৮ দিন পরও মোজতবা খামেনিকে জনসমক্ষে দেখা যায়নি। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত একটি লিখিত বার্তার মাধ্যমেই তিনি জনগণের উদ্দেশে বক্তব্য দিয়েছেন। এতে তার শারীরিক অবস্থার বিষয়ে নানা জল্পনা তৈরি হয়েছে। এমনকি ডোনাল্ড ট্রাম্পও বলেছেন, তিনি হয়তো ঘোষিত অবস্থার চেয়ে বেশি আহত।
মাযাহের হোসেইনি দাবি করেন, উত্তরাধিকার প্রক্রিয়া ভণ্ডুল করতে মোহাম্মদ শিরাজিকেও লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। কারণ, তিনি সামরিক নেতৃত্ব ও সর্বোচ্চ নেতার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ ছিলেন। তিনি বলেন, ‘তার কাছে সব সামরিক সদস্যের তথ্য ছিল। শত্রুরা জানত, সর্বোচ্চ নেতাকে লক্ষ্য করার পাশাপাশি তাকেও হত্যা করতে হবে, যাতে নেতৃত্ব পুনর্গঠন কঠিন হয়ে পড়ে।’
ফাঁস হওয়া এই অডিওর পর মোজতবা খামেনির শারীরিক অবস্থা ও নেতৃত্ব দেয়ার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন আরও বেড়েছে। সোমবার ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা জানি না তিনি জীবিত কি না।’
একজন ইরানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দেশটির সামরিক কমান্ডারদের কাছেও সর্বোচ্চ নেতার বর্তমান অবস্থার কোনও তথ্য নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থার মূল্যায়নে বলা হয়েছে, আলি খামেনি নিজেই তার ছেলের উত্তরসূরি হওয়ার বিষয়ে আপত্তি করেছিলেন। সিবিএস নিউজের তথ্য অনুযায়ী, তিনি মোজতবাকে ‘খুব মেধাবী নন’ এবং ‘নেতৃত্বের যোগ্য নন’ বলে মনে করতেন।
মোজতবা খামেনি প্রথম আলোচনায় আসেন ১৯৮৫ সালে। তখন তার বয়স ছিল ১৭ বছর এবং সেসময় ইরান-ইরাক যুদ্ধে ফ্রন্টলাইনে থাকা অবস্থায় এক সপ্তাহ নিখোঁজ ছিলেন। তখনও তার বাবা সর্বোচ্চ নেতা হননি।
