ঈদে বাসের টিকিট ফ্রি, ভাড়া নিতে চালকদের হাতে-পায়ে ধরছেন যাত্রীরা

গাবতলী বাস টার্মিনালে আজ এক অদ্ভুত, গা ছমছমে নীরবতা। প্রতি বছর ঈদের আগে এই টার্মিনালের যে রূপ থাকে, তার সঙ্গে আজকের চিত্রের কোনো মিল নেই। সাধারণত এই সময়ে বাতাসে ভাসে ঘাম, ধুলো আর বাসের পোড়া মবিলের গন্ধ। কানে তালা লেগে যাওয়ার মতো চিৎকারে হেলপাররা ডাকতে থাকেন, ‘রংপুর-দিনাজপুর-বগুড়া! ডাইরেক্ট সিট, কোনো লোকাল নাই!’ যাত্রীরা একে অপরের ঘাড়ে উঠে, কাউন্টারের ছোট ছিদ্র দিয়ে হাত গলিয়ে টিকিট নামক সোনার হরিণ ছিনিয়ে আনার যুদ্ধে লিপ্ত হন। কিন্তু এবারের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।

টার্মিনালে ঢুকতেই শোনা গেল এক কাউন্টার মাস্টারের মধুমাখা কণ্ঠস্বর, ‘আসুন স্যার, ভেতরে আসুন। এসি চলছে, সোফায় বসুন। চা খাবেন নাকি ঠান্ডা?’

এবারের ঈদযাত্রার আগে এক মন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মৃদু হেসে ঘোষণা করেছিলেন, ‘এবারের ঈদে পরিবহনের ভাড়া সমঝোতার মাধ্যমে স্বাভাবিকের চেয়েও অনেক কম।’ মন্ত্রীর এই বক্তব্যের পরপরই দেশের স্বনামধন্য যাত্রী কল্যাণ সমিতি একটি জাঁকজমকপূর্ণ সংবাদ সম্মেলন করে দাবি করে বসে, ‘গত ২০ বছরের মধ্যে এবার বাসের ভাড়া সবচেয়ে বেশি! যাত্রীদের রীতিমতো সমঝোতার মাধ্যমে গলাকাটা হচ্ছে।’

সাধারণ মানুষ পড়ল এক মহা ধন্দে। মন্ত্রী বলছেন ভাড়া কম, সমিতি বলছে ২০ বছরের রেকর্ড ভাঙা বেশি! কিন্তু আসল সত্যটা বেরিয়ে এলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে। গত দুদিন ধরে ফেসবুকে রীতিমতো ঝড় বইছে। মানুষজন স্ট্যাটাস দিচ্ছে, ট্রল করছে, মিম বানাচ্ছে। কারণ, বাস্তবে এবার বাসের ভাড়া কমও নয়, বেশিও নয়; বরং এবার বাস ভাড়া নিচ্ছেই না! পরিবহন মালিকরা মন্ত্রীর কথাকে এমনভাবে অন্তরে ধারণ করেছেন যে, তারা যাত্রীদের কাছ থেকে এক পয়সাও নিতে রাজি নন। উল্টো যাত্রীরা জোর করে ভাড়া দিতে গিয়ে বাসের হেলপার, ড্রাইভার আর কাউন্টার মাস্টারদের হাতে-পায়ে ধরছেন।

দৃশ্যপট ১: গাবতলী কাউন্টারে হাহাকার

রহিম সাহেব একজন আদ্যোপান্ত মধ্যবিত্ত বাঙালি। প্রতি বছর ঈদে বাড়ি যাওয়ার সময় বাসের টিকিট কাটতে গিয়ে তার মাসিক বেতনের এক-তৃতীয়াংশ হাওয়া হয়ে যায়। এবারও তিনি প্যান্টের পকেটে দশ হাজার টাকা গুঁজে, বুক ফুলিয়ে গাবতলী এসেছেন। মনে মনে প্রস্তুতি নিয়ে এসেছেন, কাউন্টার মাস্টার ৫ হাজার চাইলে তিনি ৩ হাজার বলে দরদাম শুরু করবেন।

তিনি শ্যামলী-হানিফ- নাবিল-এর মতো কোনো এক বিলাসবহুল বাসের কাউন্টারে গিয়ে স্বভাবসুলভ রাগী গলায় বললেন, ‘ভাই, রংপুরের দুইটা টিকিট দেন। কত করে?’

কাউন্টার মাস্টার রহমান সাহেব অত্যন্ত বিনীতভাবে হেসে বললেন, ‘স্যার, জিরো টাকা। মানে একদম ফ্রি। আপনি যে আমাদের বাসে উঠে রংপুর যেতে রাজি হয়েছেন, এটাই আমাদের বড় পাওয়া। এই নিন স্যার আপনার টিকিট, আর এই নিন কমপ্লিমেন্টারি দুই বোতল মিনারেল ওয়াটার।’

রহিম সাহেবের চোখ কপালে উঠে গেল। তিনি ভাবলেন, নিশ্চয়ই কোনো নতুন ধরনের স্ক্যাম। তিনি গলা নামিয়ে ফিসফিস করে বললেন, ‘রহমান ভাই, আমি তো আর মিডিয়ার লোক না। আমাকে আসল কথা কন। ঈদের বকশিশসহ কত দেব? এই নেন দুই হাজার টাকা, চুপিচুপি পকেটে রাইখা দেন।’

রহমান সাহেব টাকা দেখে রীতিমতো আঁতকে উঠলেন। তিনি দুই হাত জোড় করে বললেন, ‘আরে স্যার করেন কী! করেন কী! কেউ দেখে ফেলবে তো! মন্ত্রী মহোদয় বলেছেন ভাড়া কম, মালিক সমিতি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কম হতে হতে এটা এখন শূন্যের কোঠায় নেমেছে। আমরা যদি আপনার কাছ থেকে এক টাকাও নিই, আমাদের চাকরি তো যাবেই, সঙ্গে মালিক আমাদের গাবতলী থেকে বুড়িগঙ্গায় ফেলে দেবে। দয়া করে টাকাটা পকেটে রাখুন স্যার। আমাকে বিপদে ফেলবেন না।’

রহিম সাহেব এবার রেগে গেলেন, ‘কী আশ্চর্য! আমি কি ফকিন্নির পুত নাকি যে মাগনা বাসে যামু? আমার টাকা আছে! আমি ঈদ করতে বাড়ি যাচ্ছি, পকেট কেটে রক্ত বের না হলে কি ঈদের ফিল আসে? আপনারা আমার কাছ থেকে টাকা নেবেন, আমি গালি দেব, তবেই না মনে হবে ঈদযাত্রা! টাকা আপনাকে রাখতেই হবে!’

রহিম সাহেব জোর করে এক হাজার টাকার একটা নোট রহমান সাহেবের পকেটে গুঁজে দেওয়ার চেষ্টা করলেন। রহমান সাহেব হাউমাউ করে কেঁদে উঠে কাউন্টারের টেবিলের নিচে লুকিয়ে পড়লেন, ‘বাঁচান! আমাকে জোর করে টাকা দিচ্ছে! কেউ পুলিশ ডাকেন!’

দৃশ্যপট ২: মহাসড়কে চলন্ত বাসে আবেগময় দৃশ্য

ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে চলছে একটি যাত্রীবাহী বাস। বাসের ভেতরের পরিবেশ থমথমে। যাত্রীদের চোখেমুখে এক অদ্ভুত অপরাধবোধ। বাসের হেলপার, যার নাম মফিজ, সে যাত্রীদের মাঝে ট্রে-তে করে প্যাকেট বিরিয়ানি আর কোল্ড ড্রিংকস বিতরণ করছে।

পেছনের সিট থেকে এক বয়স্ক যাত্রী, নাম কদ্দুস মিয়া, মফিজের হাত চেপে ধরলেন। কদ্দুস মিয়ার চোখে পানি। তিনি কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন, ‘বাবা মফিজ, তুই আমার সন্তানের মতো। প্রতি বছর তুই মুড়ার সিটে (টুলের ওপর) বসাইয়া আমার কাছ থিকা ৮০০ টাকা নিস। এবার আমি এসির নিচে নরম সিটে বসে যাচ্ছি, আর তুই আমাকে বিরিয়ানি খাওয়াচ্ছিস। আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছে বাবা। এই নে পাঁচশ টাকা, অন্তত তোর চা-পানের খরচ রাখ।’

মফিজ চোখের পানি মুছতে মুছতে নিজের গামছা দিয়ে কদ্দুস মিয়ার হাতটা সরিয়ে দিল। ‘না চাচা, আমারে পাপের ভাগী করবেন না। আমি টাকা ছুঁতে পারমু না। আমার ইউনিয়ন লিডার বইলা দিছে, কোনো হেলপার যদি যাত্রীর কাছ থেকে একটা টাকাও নেয়, তারে বাসের চাকায় বাইন্ধা ঢাকা টু চট্টগ্রাম ঘুরাইবো। আপনারা শান্তিমতো বিরিয়ানি খান। লাগলে আরও দুই প্যাকেট দিমু, কিন্তু টাকার কথা কইবেন না।’

বাসের আরেক যাত্রী, আধুনিক তরুণ ফয়সাল, স্মার্টফোন বের করে লাইভে চলে গেল। ‘হ্যালো গাইজ! আমি এখন হাইওয়েতে আছি। আপনারা দেখতে পাচ্ছেন, এই বাসের স্টাফরা আমাদের জিম্মি করে ফেলেছে! তারা কোনোভাবেই আমাদের কাছ থেকে ভাড়া নিচ্ছে না! আমরা জোর করে টাকা দিতে গেলে তারা বাস খাদে ফেলে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে! প্লিজ কেউ আমাদের বাঁচান! আমরা আমাদের কষ্টার্জিত টাকা দিয়ে টিকিট কিনতে চাই!’

দৃশ্যপট ৩: ফেসবুকের টাইমলাইনে ব্যঙ্গর বন্যা

এদিকে ফেসবুক, এক্স (সাবেক টুইটার) আর টিকটকে রীতিমতো মিমের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। নেটিজেনরা তাদের সৃজনশীলতার চূড়ান্ত পর্যায় প্রদর্শন করছেন।

এক তরুণ স্ট্যাটাস দিয়েছেন: ‘বাসের কন্ডাক্টরকে বললাম, ভাই ১০০ টাকা রাখেন। সে আমাকে উল্টো ৫০০ টাকা দিয়ে বলল, ‘স্যার, আপনার প্যান্টের পকেট ছেঁড়া, এই টাকা দিয়ে নতুন প্যান্ট কিনে নিয়েন, কিন্তু ভাড়ার কথা বলবেন না।’ আমি এখন চরম ডিপ্রেশনে ভুগছি।’

আরেকজনের মিম: একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে, একজন যাত্রী বাসের টায়ারের নিচে শুয়ে আছেন, আর ড্রাইভারকে বলছেন, ‘আমার কাছ থেকে ডাবল ভাড়া না নিলে আমি বাসের চাকার নিচ থেকে উঠব না। আমার ইগোতে লেগেছে!’

হ্যাশট্যাগ ট্রেন্ডিং চলছে: #WeWantToPay, #আমাদের_ভাড়া_নেওয়ার_অধিকার_ফিরিয়ে_দাও, #গলাকাটা_ভাড়া_আমাদের_ঐতিহ্য।

একটি ভাইরাল টিকটক ভিডিওতে দেখা গেল, একজন যাত্রী বাসের সাইলেন্সার পাইপের ভেতরে জোর করে ৫০০ টাকার নোট গুঁজে দেওয়ার চেষ্টা করছেন, কারণ বাসের কেউ তার টাকা নিতে রাজি হয়নি। তিনি ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকে করুণ সুর লাগিয়ে ভিডিওতে লিখেছেন, ‘টাকা আজ বড়ই সস্তা, নেওয়ার মানুষ নেই।’

দৃশ্যপট ৪: বিশেষজ্ঞ মহলে চরম বিভ্রান্তি

যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রধান, যিনি গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দিনরাত এক করে এক্সেল শিটে ডাটা এন্ট্রি করে ২০ বছরের বাসের ভাড়ার ইতিহাস ঘেঁটে একটি রিপোর্ট তৈরি করেছিলেন, তিনি এখন গভীর হতাশায় নিমজ্জিত। তার রিপোর্টের শিরোনাম ছিল, ‘ঈদে ইতিহাসের সর্বোচ্চ ভাড়া আদায়।’ কিন্তু এখন তিনি বুঝতে পারছেন না, জিরো (০) টাকাকে কীভাবে ‘সর্বোচ্চ ভাড়া’ হিসেবে প্রমাণ করবেন।

তিনি তড়িঘড়ি করে একটি জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডাকলেন। সেখানে তিনি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললেন, ‘এটি যাত্রীদের বিরুদ্ধে এক গভীর ষড়যন্ত্র! পরিবহন মালিকরা ফ্রিতে বাস সার্ভিস দিয়ে যাত্রীদের মানসিক নির্যাতনের শিকার করছেন। আমাদের দেশের যাত্রীরা প্রতি বছর ঈদে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে, বাসের ছাদে চড়ে, হেলপারের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি করে বাড়ি যাওয়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকে। এটা তাদের এক ধরনের অ্যাডভেঞ্চার। ফ্রিতে এসি বাসে শুয়ে-বসে বাড়ি পাঠানো তাদের মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন! আমরা অবিলম্বে আগের মতো তিনগুণ ভাড়া আদায়ের দাবি জানাচ্ছি। যাত্রীদের পকেট কাটার অধিকার তাদের ফিরিয়ে দিতে হবে!’

এদিকে একজন বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী একটি টকশোতে এসে গম্ভীর মুখে বললেন, “দেখুন, বাঙালি জাতি হলো সংগ্রাম প্রিয়। তারা যখন দেখে যে কোনো কষ্ট ছাড়াই তারা বাড়ি পৌঁছে যাচ্ছে, তখন তাদের মধ্যে এক ধরনের আইডেন্টিটি ক্রাইসিস বা আত্মপরিচয়ের সংকট দেখা দেয়। তারা ভাবতে শুরু করে, ‘আমি কি আসলেই বাড়ি যাচ্ছি, নাকি মরে গিয়ে বেহেশতে চলে এসেছি?’ এই ফ্রিতে বাস সেবা আমাদের সামাজিক কাঠামোর জন্য এক মারাত্মক হুমকি। মানুষের সহ্যশক্তি কমে যাবে!”

দৃশ্যপট ৫: রাজপথে যাত্রীদের আন্দোলন

ঈদের ঠিক দুদিন আগে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল। গাবতলী ও সায়েদাবাদ টার্মিনালে হাজার হাজার যাত্রী বিক্ষোভ শুরু করলেন। তাদের হাতে প্ল্যাকার্ড। প্ল্যাকার্ডে লেখা, ‘মাগনা যাত্রা মানি না, মানব না’, ‘আমার টাকা, আমার অধিকার’, ‘হেলপার ভাই, ভাড়া নে, নইলে আমার বুকে গুলি কর।’

যাত্রীরা বাসের সামনে শুয়ে পড়ে রাস্তা অবরোধ করলেন। তাদের একটাই দাবি—বাস মালিকদের অতিরিক্ত ভাড়া নিতেই হবে।

আন্দোলনরত এক যাত্রী, যিনি একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করেন, গণমাধ্যমের সামনে মাইক্রোফোন পেয়ে হাউমাউ করে কেঁদে ফেললেন। ‘ভাই, সারা বছর বসের গালি খাই, বউয়ের ঝাড়ি খাই। আমার জীবনের একমাত্র বিনোদন ছিল ঈদের সময় বাসের হেলপারের সঙ্গে ভাড়া নিয়ে তুমুল ঝগড়া করা। ওই ঝগড়াটা না করলে আমার মনেই হয় না যে ঈদ এসেছে। এরা আমার কাছ থেকে সেই আনন্দটুকু কেড়ে নিয়েছে। আমি ফ্রিতে বাড়ি যাব না! আমি ডাবল ভাড়া দিয়ে, বাসের ইঞ্জিনের কভারের ওপর বসে, গরমে সিদ্ধ হয়ে বাড়ি যেতে চাই! প্লিজ, আমাদের আগের দিনগুলো ফিরিয়ে দিন!’

দৃশ্যপট ৬: গন্তব্যে পৌঁছানোর পর মহানাটক

সব বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে, ফ্রিতে এসি বাসে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে যাত্রীরা যখন তাদের নিজ নিজ গন্তব্যে, যেমন—রংপুর, রাজশাহী বা সিলেটে পৌঁছালেন, তখন শুরু হলো আরেক মহানাটক।

বাস থেকে নামার সময় যাত্রীরা একজোট হলেন। তারা সিদ্ধান্ত নিলেন, বাসের স্টাফদের হাতে টাকা না দেওয়া পর্যন্ত কেউ বাস থেকে নামবেন না। ড্রাইভার সাহেব বাস থামিয়ে দরজা খুলে দিয়ে বললেন, ‘স্যার, আপনারা পৌঁছে গেছেন। এবার দয়া করে নেমে যান। আপনাদের ঈদ শুভ হোক।’

কিন্তু যাত্রীরা সিট থেকে উঠছেন না। তারা সবাই পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে টাকা হাতে নিয়ে বসে আছেন। রহিম সাহেব বাসের ভেতর থেকে লিড দিচ্ছেন। তিনি বললেন, ‘ড্রাইভার ভাই, আমরা নামব, কিন্তু তার আগে আপনাকে আমাদের কাছ থেকে জনপ্রতি ১৫০০ টাকা করে নিতে হবে। আপনি টাকা না নিলে আমরা এই বাসেই ঈদ করব। দরকার হলে এই বাসকেই আমরা আমাদের স্থায়ী ঠিকানা বানাব।’

ড্রাইভার এবং হেলপার মফিজ দুজনেই ভয়ে কাঁপতে শুরু করলেন। মফিজ বলল, ‘স্যার, আপনারা আমাদের পেটে লাথি মারবেন না। আমরা টাকা নিলে মালিক আমাদের জ্যান্ত কবর দিয়ে দেবে। আপনারা দয়া করে নেমে যান। আপনাদের পায়ে ধরি স্যার!’ এই বলে হেলপার মফিজ সত্যি সত্যিই রহিম সাহেবের পায়ের কাছে বসে পড়ল।

রহিম সাহেব পা সরিয়ে নিয়ে বললেন, ‘আরে ভাই, তুমি আমার পায়ে ধরো কেন? আমি তোমার পায়ে ধরছি। এই নাও টাকা!’ রহিম সাহেবও বাসের ফ্লোরে বসে মফিজের পা চেপে ধরলেন।

শুরু হলো এক অদ্ভুত প্রতিযোগিতা। যাত্রীরা বাসের স্টাফদের পায়ে ধরছেন টাকা নেওয়ার জন্য, আর স্টাফরা যাত্রীদের পায়ে ধরছেন টাকা না দিয়ে বাস থেকে নেমে যাওয়ার জন্য। পুরো বাসের ভেতর এক আবেগঘন, অথচ চরম হাস্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো।

শেষমেশ যাত্রীরা এক অভিনব কৌশল অবলম্বন করলেন। তারা সবাই একসাথে নিজেদের হাতের টাকাগুলো ড্রাইভারের ক্যাবিনের দিকে ছুড়ে মারলেন। টাকার বৃষ্টিতে ড্রাইভার আর হেলপার ঢেকে গেলেন। এরপর যাত্রীরা হুড়মুড় করে বাস থেকে নেমে ভোঁ দৌড় দিলেন, যেন কোনো বিশাল বড় অপরাধ করে পালিয়ে যাচ্ছেন।

ড্রাইভার আর হেলপার সেই টাকার স্তূপের ভেতর বসে রইলেন। তাদের চোখেমুখে আতঙ্ক। এখন এই টাকা তারা কী করবেন? মালিক তো তাদের আস্ত রাখবে না!

বাড়ি পৌঁছে রহিম সাহেব ড্রয়িংরুমে সোফায় হেলান দিয়ে বসলেন। তার শরীর একদম ফুরফুরে, কোনো ক্লান্তি নেই। রাস্তায় কোনো জ্যাম ছিল না, কেউ তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেনি, এমনকি বাসে তাকে ফ্রিতে বিরিয়ানিও খাওয়ানো হয়েছে। কিন্তু তার মনের ভেতর এক গভীর শূন্যতা।

তিনি তার স্ত্রীকে ডেকে বললেন, ‘বুঝলা, এবারের ঈদটা একদম মাটি হয়ে গেল।’

স্ত্রী অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কেন? কোনো সমস্যা হয়েছে রাস্তায়?’

রহিম সাহেব দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘না, কোনো সমস্যা হয়নি। এটাই তো সবচেয়ে বড় সমস্যা। কেউ আমার পকেট কাটল না, কেউ আমাকে মুড়ার সিটে বসাল না, কেউ গলাকাটা ভাড়া চাইল না। এ কেমন ঈদ? কোথায় গেল আমাদের সেই ঐতিহ্য? কোথায় গেল আমাদের সেই সংগ্রাম? মন্ত্রী মহোদয় আর পরিবহন মালিকরা মিলে আমাদের ঈদের আসল আনন্দটাই কেড়ে নিল!’

বাইরে তখন ঈদের চাঁদ দেখা গেছে। পাড়ার মসজিদে মাইকে ঘোষণা হচ্ছে, ‘আগামীকাল পবিত্র ঈদুল ফিতর।’ কিন্তু দেশের হাজার হাজার যাত্রীর মনে আজ কোনো আনন্দ নেই। তাদের একটাই আক্ষেপ—পরবর্তী ঈদে অন্তত যেন বাসের ভাড়াটা তিনগুণ বেশি নেওয়া হয়, যাতে তারা আবার বুক ফুলিয়ে বলতে পারেন, ‘ঈদযাত্রা মানেই তো একটু কষ্ট, আর একটু গলাকাটা ভাড়া!’

Leave a Comment

Scroll to Top