ইউরোপের দেশ ইতালিতে বড় ভাইয়ের হাতে ছোট ভাই খুনের ঘটনায় একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসছে। পরকীয়া সম্পর্ক, গোপন দ্বিতীয় বিয়ে, পারিবারিক দ্বন্দ্ব এবং বিপুল অর্থ লেনদেন—সব মিলিয়ে ঘটনাটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে অভিযোগ স্বজনদের। এ ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে মুন্সীগঞ্জ জেলার টঙ্গীবাড়ী উপজেলার একটি প্রবাসী পরিবারে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, উপজেলার পশ্চিম সোনারং গ্রামের দুই ভাই—হুমায়ুন ফকির ও নয়ন ফকির—দুজনই ইতালিতে বসবাস করতেন। ইতালির একটি শহরে (স্থানীয়ভাবে লেইজ নামে পরিচিত) সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ডটি এখন এলাকায় তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও ব্যক্তিগত জটিলতা
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র ও পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, হুমায়ুন ফকিরের ব্যক্তিগত জীবনেই তৈরি হয়েছিল নানা জটিলতা। প্রথম স্ত্রী আমেনা আফরিন থাকা সত্ত্বেও তিনি নিজের চাচাতো বোন তায়েবার সঙ্গে দীর্ঘদিন পরকীয়ায় জড়ান। পরে দেশে এসে গোপনে দ্বিতীয় বিয়েও করেন। এই বিয়ে পরিবার মেনে নেয়নি, ফলে বাবা-মা ও ভাইয়ের সঙ্গে তার সম্পর্ক ক্রমেই অবনতি ঘটে।
পরিবার জানায়, দ্বিতীয় স্ত্রীকে বাড়িতে তোলাকে কেন্দ্র করে হুমায়ুনের বাবা দেলোয়ার হোসেন ক্ষোভে ওই ঘরের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। এতে হুমায়ুন আরও ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন এবং ছোট ভাই নয়নের সঙ্গে তার সম্পর্ক তিক্ত হয়ে যায়।
অর্থনৈতিক দ্বন্দ্বও বাড়ায় উত্তেজনা
পারিবারিক দ্বন্দ্বের পাশাপাশি অর্থনৈতিক বিষয়ও পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। হুমায়ুন নিজ খরচে নয়নকে ইতালি নিয়ে গেলেও, পরবর্তীতে নয়ন বিভিন্ন সময়ে প্রায় ২০ লাখ টাকা পরিশোধ করেন। এরপরও হুমায়ুন পরিবারের খরচের অর্ধেক হিসেবে আরও ৮ লাখ টাকা দাবি করেন।
পরিবারের দাবি, নয়ন টাকা দিতে রাজি থাকলেও এর আগেই তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়।
পরিকল্পিত হত্যার অভিযোগ
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) ইতালির স্থানীয় সময় বিকেল ৫টার দিকে নয়ন ফকির বড় ভাইয়ের বাসার নিচে বৈদ্যুতিক সাইকেল চার্জ দিতে যান। এ সময় ওত পেতে থাকা হুমায়ুন পেছন থেকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার পিঠ ও মাথায় আঘাত করেন। ঘটনাস্থলেই গুরুতর আহত হয়ে নয়ন মারা যান।
স্বজনদের অভিযোগ, হত্যার পর হুমায়ুন ভিডিও কলে মরদেহ দেশে থাকা মা-বাবাকে দেখান, যা ঘটনাটিকে আরও নৃশংস ও শোকাবহ করে তুলেছে।
স্বজনদের বক্তব্য
নিহতের বোন দিলারা আক্তার বলেন, “নিজের ভাইকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আমরা এই হত্যার সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।”
প্রথম স্ত্রী আমেনা আফরিন অভিযোগ করেন, “হুমায়ুন দীর্ঘদিন ধরে আমাকে মানসিকভাবে নির্যাতন করতেন এবং ভরণপোষণ দিতেন না।”
আইনগত প্রক্রিয়া ও তদন্ত
বর্তমানে অভিযুক্ত হুমায়ুন ইতালিয়ান পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন। স্থানীয় আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। ইতালির আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘটনাটির বিভিন্ন দিক—বিশেষ করে পারিবারিক বিরোধ, আর্থিক লেনদেন ও ব্যক্তিগত সম্পর্ক—খতিয়ে দেখছে।
সামাজিক প্রতিক্রিয়া
স্থানীয়দের মতে, পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, অবৈধ সম্পর্ক এবং অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব মিলেই এমন মর্মান্তিক পরিণতি ডেকে এনেছে। প্রবাসজীবনের চাপ, দূরত্ব এবং পারিবারিক যোগাযোগের ঘাটতিও এ ধরনের ঘটনার পেছনে ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন অনেকে।
এদিকে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্বজনদের দাবি—দ্রুত বিচার নিশ্চিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমে এমন ঘটনার বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দেওয়া হোক।
