জামায়াত আমিরের প্রার্থিতা বাতিল চেয়ে সিইসির কাছে আবেদন

বাংলাদেশ জামায়াতের ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের প্রার্থিতা বাতিলের দাবিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের কাছে লিখিত আবেদন জানিয়েছেন দেশের বিভিন্ন নারী নেত্রী ও অধিকারকর্মীরা। ডা. শফিকুর রহমানের ভ্যারিফায়েড ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট হ্যাকড করে নারীদের নিয়ে করা অবমাননাকর ও নারীবিদ্বেষী মন্তব্যকে কেন্দ্র করেই এ দাবি জানানো হয়।

রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে সিইসির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আবেদনপত্র জমা দেন তারা। এ সময় গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোশরেফা মিশু সাংবাদিকদের জানান, একজন শীর্ষ রাজনৈতিক নেতার কাছ থেকে এ ধরনের মন্তব্য শুধু অগ্রহণযোগ্যই নয়, বরং তা সংবিধানস্বীকৃত নারী মর্যাদা ও সমতার সরাসরি লঙ্ঘন।

লিখিত আবেদনে উল্লেখ করা হয়, সম্প্রতি জামায়াত আমির তার ভ্যারিফায়েড এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে কর্মজীবী নারীদের সম্পর্কে যে মন্তব্য করেছেন, তা কুরুচিপূর্ণ, অবমাননাকর ও গভীরভাবে নারীবিদ্বেষী। এসব মন্তব্য দেশের কোটি কোটি শ্রমজীবী নারীর আত্মমর্যাদা, সামাজিক অবদান ও শ্রমের প্রতি চরম অবজ্ঞার শামিল।

পরে সংশ্লিষ্ট দলের পক্ষ থেকে ওই বক্তব্যকে ‘হ্যাকিং’-এর ফল বলে দাবি করা হলেও, একটি ভ্যারিফায়েড অ্যাকাউন্ট থেকে প্রকাশিত বক্তব্যের ক্ষেত্রে এমন ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য নয় বলে আবেদনকারীরা মনে করেন।

আবেদনে আরও বলা হয়, কথিত হ্যাকিংয়ের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা, নিরপেক্ষ তদন্ত প্রতিবেদন কিংবা প্রামাণ্য তথ্য এখনো জনসমক্ষে আনা হয়নি। ফলে হ্যাকিংয়ের দাবি সন্দেহজনকই থেকে যাচ্ছে।

এ বিষয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, ওই হ্যাকিং অভিযোগে বঙ্গভবনের এক কর্মীকে গ্রেপ্তার দেখানো হলেও পুলিশের পক্ষ থেকে এ নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া গেছে। পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারাই স্বীকার করেন, আটক ব্যক্তির বিরুদ্ধে হ্যাকিংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ তথাকথিত হ্যাকিং দাবিকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়।

আরও পড়ুন: চট্টগ্রাম বন্দর সচল রাখতে হার্ডলাইনে যাচ্ছে সরকার: নৌপরিবহন উপদেষ্টা

নারী নেত্রীরা বলেন, গত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে শ্রমজীবী নারীরা তাদের নিরলস পরিশ্রমের মাধ্যমে পরিবার, সমাজ এবং জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। সেই শ্রমজীবী নারীদের অবদানকে অবমূল্যায়ন করে প্রকাশ্যে এ ধরনের মন্তব্য সংবিধান, মানবাধিকার, নারী মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের পরিপন্থি।

আবেদনে আরও বলা হয়, এ ধরনের বক্তব্য নারীর প্রতি ঘৃণা, বৈষম্য ও সহিংসতার সংস্কৃতিকে উসকে দেয়, যা নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও কর্মপরিবেশকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলে। একজন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তির কাছ থেকে এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

এই প্রেক্ষাপটে আবেদনকারীরা নির্বাচন কমিশনের কাছে একাধিক দাবি জানান। এর মধ্যে রয়েছে-অবিলম্বে ওই অবমাননাকর বক্তব্য প্রকাশ্যে প্রত্যাহার, কর্মজীবী নারী ও নারী শ্রমিকদের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা, ভবিষ্যতে নারীর মর্যাদা ও শ্রমকে হেয় করে এমন বক্তব্য না দেয়ার সুস্পষ্ট অঙ্গীকার এবং নির্বাচন কমিশনের আচরণবিধি ও নৈতিকতার আলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ। পাশাপাশি তারা ডা. শফিকুর রহমানের প্রার্থিতা বাতিলের দাবি জানান।

সিইসির সঙ্গে সাক্ষাৎকালে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা, গার্মেন্টস শ্রমিক মুক্তি আন্দোলনের সভাপতি শবনম হাফিজ, এনপিএ মুখপাত্র ফেরদৌস আরা রুমী, নারীর রাজনৈতিক অধিকার ফোরামের সংগঠক নাফিসা রায়হানা এবং আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী তাবাসসুম মেহেনাজ মিমি।

প্রসঙ্গত, জামায়াত আমিরের ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্ট হ্যাকড হওয়ার পর সংবাদ সম্মেলন করে প্রতিবাদ ও নিন্দা জানায় দলটি। সেই সঙ্গে অ্যাকাউন্ট হ্যাকিংয়ের বিস্তারিত সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরা হয়। পরবর্তীতে হ্যাকিংয়ের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে বঙ্গভবনের আইটি শাখার সহকারী প্রোগ্রামার মোহাম্মদ ছরওয়ারে আলমকে আটক করে ডিবি।

পরবর্তীতে গত বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) হাতিরঝিল থানায় সাইবার সুরক্ষা আইনে দায়ের করা মামলার শুনানি শেষে ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আওলাদ হোসাইন মুহাম্মদ জুনাইদ তার জামিন মঞ্জুর করেন। বাদীপক্ষের আইনজীবী জামিনের বিরোধিতা করলেও, আসামিপক্ষের আইনজীবী মো. আলমগীর জামিনের আবেদন করেন।

এএ

Leave a Comment

Scroll to Top