যেকোনো সময় গ্রেপ্তার হতে পারেন সাবেক উপদেষ্টা সাখাওয়াত

যেকোনো সময় গ্রেপ্তার হতে পারেন অর্ন্তবর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও ওয়ান–ইলেভেনের সময়কার নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন। ওয়ান–ইলেভেনের অন্যতম অনুকুশীলব, কুচক্রীদের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের পক্ষে যোগাযোগ রক্ষা করা, বিএনপি ভাঙার অপচেষ্টা ও অতিরিক্ত ব্যালট পেপার ছাপানোর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এ ছাড়া সদ্য বিদায়ি অর্ন্তবর্তী সরকারের সময়ে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে তাঁর পুত্র এম সাফাক হোসেনের একচ্ছত্র প্রভাবে বন্দরে অচলাবস্থার সৃষ্টির বিষয়গুলো নিয়েও তদন্ত হবে বলে জানা গেছে। এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে ।

ওয়ান–ইলেভেনের সময় সাখাওয়াত হোসেন ছিলেন নির্বাচন কমিশনের প্রভাবশালী কমিশনার। সম্প্রতি লে. জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ও লে. জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদকে গ্রেপ্তারের পর সাখাওয়াত হোসেন সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর তথ্য জানা গেছে। একাধিক সূত্রে জানা গেছে, মূলত মইন, মাসুদের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি নির্বাচন কমিশনের কমিশনার হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। তার দায়িত্ব ছিল কমিশনের পক্ষে কুচক্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা। তারা যেভাবে নির্দেশনা দিতেন তা বাস্তবায়ন করা। সে সময় বিএনপিকে ভাঙার অপচেষ্টার নেতৃত্বও তিনিই দিয়েছিলেন। সবচেয়ে গুরুতর অপরাধ হলো ২০০৮–এর নির্বাচনে বিএনপিকে পরাজিত করতে যে অতিরিক্ত ব্যালট পেপার ছাপানো হয়, সেগুলো তার তত্ত্বাবধানেই হয়েছিল। ব্যালটের ডিজাইনসহ অন্যান্য প্রিন্টিং তথ্য–উপাত্ত লে. জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদকে তিনি সরবরাহ করেছিলেন।

শেখ মামুন তখন ডিজিএফআইয়ের পরিচালক ছিলেন। ওয়ান–ইলেভেনের সময় প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছিলেন ড. এ টি এম শামসুল হুদা ও অপর কমিশনার ছিলেন মুহাম্মদ ছহুল হোসাইন। সচিব ছিলেন হুমায়ূন কবির। মইন, মাসুদদের প্রভাবে এই তিনজনকে সব সময় চাপে রাখতেন সাখাওয়াত। সে কারণে সাখাওয়াতের সিদ্ধান্তের বাইরে তাদের কিছুই করার ছিল না। এ সময় ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রকল্পের পিডি ছিলেন ব্রিগেডিয়ার শাহাদাত হোসেন চৌধুরী। যুগ্ম সচিব ছিলেন ড. রফিকুল ইসলাম। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকার প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদা কমিশনে এই দুইজনকে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দেয়। সূত্র জানিয়েছে, ওয়ান–ইলেভেনের সময় মইন, মাসুদ ও শেখ মামুনের অন্যতম সহযোগী হিসেবে যেসব অপকর্মের অভিযোগ পাওয়া গেছে, সেগুলোর সত্যতা যাচাই করতে যেকোনো সময় গ্রেপ্তার হতে পারেন সাখাওয়াত হোসেন। বর্তমানে তিনি গোয়েন্দা নজরদারিতে আছেন বলেও একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

বিগত অর্ন্তবর্তী সরকারের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ওয়ান–ইলেভেনে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত হোসেনের অভিজ্ঞতা বিবেচনা করে অর্ন্তবর্তী সরকারে তাকে উপদেষ্টা করা হয়। কিন্তু একপর্যায়ে নানান কর্মকাণ্ড ও কথাবার্তায় সরকার বিব্রত হলে তাকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এতে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং পদত্যাগের হুমকি দেন। কিন্তু সরকারের বিভিন্ন স্পর্শকাতর দপ্তরে তার কর্মকাণ্ডের কিছু তথ্যপ্রমাণ থাকার কারণে সেই সিদ্ধান্ত থেকে তিনি সরে আসেন। এরপর ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও তার কিচেন কেবিনেটের সদস্যরা তাকে আর আস্থায় নিতে পারেননি। সে কারণে নির্বাচনসংক্রান্ত কোনো আলোচনায়ও তাকে রাখা হয়নি। অবশ্য কিচেন কেবিনেট ও নির্বাচনসংক্রান্ত সিদ্ধান্তে তাকে না রাখার ব্যাপারে তিনি নিজেই সম্প্রতি গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়ে তথ্য প্রকাশ করেছেন। সেই সাক্ষাৎকার প্রচারিত হওয়ার পর অন্য উপদেষ্টারা তার ওপর চরম ক্ষুব্ধ হন। এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশ না করে একজন সাবেক উপদেষ্টা বলেন, ‘ওয়ান–ইলেভেনের সময় বিএনপির বিরুদ্ধে ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত হোসেন যা করেছেন, সেগুলো থেকে বাঁচার জন্য তিনি অর্ন্তবর্তী সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করার মতো বক্তব্য দিয়ে বিএনপির কাছে ভালো থাকার অপচেষ্টা করেছেন।’

এদিকে অর্ন্তবর্তী সরকারের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত হোসেনকে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার পর তার পুত্র এম সাফাক হোসেন মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রণ করতেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ডেও সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক ছিল সাফাক হোসেনের। তার নেপথ্য নেতৃত্বেই চট্টগ্রাম বন্দরকে বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার চক্রান্ত হয়। এ কাজ করার জন্য অনেক বড় লেনদেন হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া বে–টার্মিনালের পরিবহন টার্মিনাল প্রকল্পের মাটি ভরাট, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং অন্যান্য কাজের সব নিয়ন্ত্রণ করেন সাফাক হোসেন। তালতলা ইয়ার্ড নির্মাণের সব কাজ নিয়ন্ত্রণ করেন সাফাক হোসেন। চট্টগ্রাম বন্দরের ১ নম্বর গেটে ক্যামিক্যাল শেড নির্মাণকাজেও হস্তক্ষেপ করেন সাফাক। চট্টগ্রাম বন্দরের প্রতিটা সিভিল কাজের জন্য ৫ শতাংশ, ডিপিএমের (সরাসরি টেন্ডার পদ্ধতি) জন্য ১০ শতাংশ কমিশন নিতেন সাফাক। যন্ত্রাংশ ক্রয়ে অনিয়মে জড়িত ছিলেন উপদেষ্টাপুত্র। তিনি কাজের ধরনভেদে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কমিশন নিতেন। সাখাওয়াতপুত্রের নানান দুর্নীতির খবর এখন চট্টগ্রাম বন্দরে সবার মুখে মুখে। এসব অভিযোগও তদন্ত করা হবে বলে জানা গেছে।

Leave a Comment

Scroll to Top