ইউনূস সরকারের অপশাসনের দায় সুশীল সমাজ এড়াবে কীভাবে?

যেকোনো দেশে সুশীল সমাজ হলো জাতির বিবেক। তারা সমাজের আলোকবর্তিকা, পথপ্রদর্শক। সরকারের ভালোমন্দ কাজের নির্মোহ বিশ্লেষণ করেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। যেকোনো সরকারের ভুল কাজের সমালোচনা করে জনগণকে সচেতন করার চেষ্টা করেন।

তাঁরা থাকেন দলমতের ঊর্ধ্বে। কিন্তু আমাদের দেশের সুশীল সমাজের বেশির ভাগ প্রতিনিধিই কারও না কারও পক্ষে। এঁদের কেউ বিশেষ রাজনৈতিক দলের সমর্থক। সেই রাজনৈতিক দলের পক্ষে সত্যমিথ্যা মিশিয়ে অবিরাম কথা বলেন।

ওই রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এলে বিভিন্ন লাভজনক চেয়ারে বসার সুযোগ খোঁজেন। আর কিছু সুশীল আছেন যাঁরা বিরাজনীতিকরণে বিশ্বাসী। এঁরা নিজেরাই ক্ষমতায় বসতে চান। এঁরা রাজনীতিবিদদের ঘৃণা করেন।

রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় এলেই তাদের বিরুদ্ধে সমালোচনার ডালি সাজিয়ে বসেন। গণতন্ত্র অকার্যকর করাই যেন এঁদের মূল উদ্দেশ্য। এঁরা রাজনৈতিক দলের কট্টর সমালোচক হওয়ার কারণে একটা নিরপেক্ষতার মুখোশ পরে থাকেন সব সময়। আর সে কারণেই সাধারণ মানুষ এঁদের কথায় মাঝেমধ্যে বিভ্রান্ত হয়। আর এ সুযোগে তাঁরা ক্ষমতা দখল করেন।

বাংলাদেশের সুশীল সমাজের এ অংশ দুই দফায় জনগণের রায় ছাড়াই ক্ষমতা দখল করতে সক্ষম হয়েছিল। প্রথম দফায় ২০০৭ সালে। যাকে আমরা এক- এগারোর সরকার বলি। আরেকবার ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর। দুই সরকার দুই প্রেক্ষাপটে ক্ষমতায় বসলেও তাঁদের কার্যক্রমের মধ্যে অদ্ভুত মিল খুঁজে পাওয়া যায়। দুটি সরকারই দেশ পরিচালনায় চরম ব্যর্থ হয়। দুই সরকারই দেশের অর্থনীতির ব্যাপক ক্ষতি করে বিদায় নেয়। সুশীল সমাজের নেতৃত্বে এ দুই সরকারের বিরুদ্ধেই দুর্নীতি এবং দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দেওয়ার বিস্তর তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়। তবে সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, এ দুটি সরকারের বিদায়ের পর সরকারের সুবিধাভোগী ও অংশীজন সুশীলরা সরকারের সমালোচনায় মুখর হন। কিন্তু সুশীল সরকার যখন ক্ষমতায় থাকে তখন তার এতটুকু সমালোচনা করেন না। এই যেমন ইউনূস সরকারের দেড় বছরের শাসনকালের কথাই ধরা যাক। ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের অংশীদার হিসেবে যাঁরা কাজ করেছেন, তাঁরা এখন ওই সরকারের কঠোর সমালোচক। সম্প্রতি বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, ‘জ্বালানি আমদানিতে হরমুজ প্রণালি বড় বাধা নয়। অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শেষ মুহূর্তে যে অসম চুক্তি করেছে তা জ্বালানিনিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য বড় ঝুঁকি।’ তাঁর এ বক্তব্য বস্তুনিষ্ঠ এবং সঠিক। কিন্তু তিনি তো ইউনূস সরকারের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকারের শ্বেতপত্র কমিটির প্রধান হিসেবে কাজ করেছিলেন। তাঁর ১৬ বিলিয়ন ডলার পাচারের রিপোর্ট কতটা স্লোগান আর কতটা তথ্যনির্ভর ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতেই পারে। শুধু তাই নয়, ইউনূস সরকারের এক বছরের মাথায় যখন অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছিল, দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন বেসরকারি খাত ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল তখনো তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থনীতির ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি তখন বলেছিলেন, ‘অর্থনীতিতে সামষ্টিক স্থিতিশীলতার একটা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে ছিল সরকারের পক্ষ থেকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা, টাকার পতন আটকানো, সুদের হার একটা অবস্থায় রাখা, বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে রাখা ইত্যাদি। কাজের ভিতরে সাফল্য এসেছে এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নাই।’ কিন্তু সে সময় অর্থনীতির বাস্তব চিত্র ছিল উল্টো। হাজার হাজার কলকারখানা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সরকার বেসরকারি উদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দসহ নানান ধরনের হয়রানি করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রায় স্তব্ধ করে দিয়েছিল। উচ্চ সুদের কারণে বন্ধ হয়ে যায় বিনিয়োগ। সরকার চলেছে ঋণ করে। বেকারত্ব এবং দারিদ্র্য বেড়েছে হুহু করে। কিন্তু দেবপ্রিয় এবং সিপিডি অর্থনীতির এ বিপর্যয়ের কথা বলেননি কেন?
ইউনূস সরকারের আমলে দেশিবিদেশি বিনিয়োগের অন্যতম বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং মব সন্ত্রাস। কিন্তু তিনি এ নিয়ে সরকারের সমালোচনা করেননি। মব সন্ত্রাস নিয়ে দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য প্রথম কথা বলেন সরকারের বিদায়ের আগে। ওসমান হাদির মৃত্যুর পর যখন প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার আক্রান্ত হয় তখন তিনি এবং সুশীলরা মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন। এর আগে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে দফায় দফায় হামলা এবং ভাঙচুর, বিভিন্ন কলকারখানায় অগ্নিসংযোগ, লুটপাট এবং অন্যান্য গণমাধ্যম অফিসে হামলার ঘটনায় তাঁর নীরবতা ও উপেক্ষার কারণ আমরা জানি না। তখন যদি তিনি জাতির বিবেক হয়ে কথা বলতেন, তাহলে হয়তো ইউনূস সরকার মব সন্ত্রাসকে এভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দিত না। শুধু দেবপ্রিয় একা নন, বিরাজনীতিকরণে বিশ্বাসী অনেক সুশীল সে সময় যেন ঘুমিয়ে ছিলেন। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক, সুশাসন এবং মানবাধিকার নিয়ে রাজনৈতিক সরকারের সময় যতটা সোচ্চার; সুশীল সরকারের আমলে ততটাই নীরব। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ঘুম থেকে জেগে উঠেছেন। দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, মানবাধিকার কমিশন আইন সংসদে উত্থাপিত না হওয়ায় তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে কড়া বিবৃতি দিয়েছেন। ব?্যাংক রেজল্যুশন আইনের সংশোধন নিয়েও তিনি সরব। কিন্তু ইউনূস সরকারের আমলে যখন দীর্ঘদিন মানবাধিকার কমিশন গঠন করা হয়নি, তখন তাঁকে এত বেশি সোচ্চার হতে দেখা যায়নি। বিনা বিচারে হাজার হাজার মানুষকে আটক করা নিয়েও তিনি ছিলেন একরকম নীরব। সবচেয়ে দৃষ্টিকটু ছিল যখন ইউনূস সরকারের সীমাহীন দুর্নীতির তথ্য সামনে আসার পরও তাঁকে এ নিয়ে কথা বলতে দেখা যায়নি। অথচ এখন তিনি ইউনূস সরকারের দুর্নীতির তদন্ত হওয়া দরকার বলে মন্তব্য করছেন। ইউনূস সরকারের আমলে কেন তিনি নীরব ছিলেন? ইউনূস সরকার কোনো ধরনের তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই ১১ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে অর্থ পাচারকারী হিসেবে চিহ্নিত করে তাঁদের সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করেন; যা ছিল আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের পরিপন্থি। কিন্তু টিআইবি এ প্রতিহিংসা এবং দুদক আইনের অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলেনি। অথচ টিআইবির নির্বাহী পরিচালক জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ একজন সদস্য।

ইউনূস সরকারের আমলে পদে পদে সংবিধান লঙ্ঘন করা হয়েছে। সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) বদিউল আলম মজুমদার ইউনূস সরকারের তথাকথিত সংস্কার নাটকের অন্যতম কুশীলব ছিলেন। আইন এবং সংবিধান নিয়ে তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য। কিন্তু ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকে তিনি একবারের জন্যও বলেননি রাষ্ট্রপতির সংবিধান সংশোধন আদেশ জারির ক্ষমতা নেই। এ রকম অসংখ্য উদাহরণ দেওয়া যায়। আওয়ামী লীগ আমলে যেসব সুশীল আওয়ামী লীগের পক্ষে কথা বলেছিলেন, তাঁদের এখন দোসর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এঁদের কেউ জেলে, কেউ আবার পলাতক।

আওয়ামী সমর্থক সুশীলরা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতে পারেন না। তাঁরা যদি আওয়ামী লীগের অপরাধের দায়ে অপরাধী হন তাহলে ইউনূস সরকারের অপশাসনের দায়ভার কেন এই সুশীলরা নেবেন না? তাঁদের কেন দোসর বলা হবে না?

অবশ্য সবাই যে একরকম ছিলেন তা নয়। আমরা ইউনূস সরকারের দেড় বছরের শাসনকালে দেখেছি সুশীল সমাজের অনেক প্রতিনিধি জাতির সত্যিকারের বিবেক হিসেবে কাজ করেছেন, কথা বলেছেন। এ প্রসঙ্গে সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিকের নাম উল্লেখ করতেই হবে। ইউনূস সরকারের শুরু থেকেই তিনি সাহসী ভূমিকায় ছিলেন। অকপটে অন্তর্বর্তী সরকারের অপশাসনের কথা বলেছেন। কিছুটা দেরিতে হলেও অধ্যাপক আনু মুহাম্মদও ইউনূস সরকারের বিভিন্ন অনিয়মের কথা তুলে ধরেছেন জনগণের সামনে। এ তালিকায় গুণিমানুষের সংখ্যা কম হলেও তাঁরাই আমাদের আদর্শ। এঁরাই জাতির পথপ্রদর্শক। আমরা অনুগত, স্তাবক সুশীলবেশী মতলববাজ চাই না। আমরা চাই সত্যিকারের আলোকিত মানুষ।

Leave a Comment

Scroll to Top